শুভ নববর্ষ : বিজ্ঞাপন বনাম উপলব্ধি

প্রিয়াঙ্গনা দেব

  আজ বাঙালি নববর্ষ। প্রত্যেক বছরই এই দিনটির জন্য চলতে থাকে অনেক দিনের প্রস্তুতি, অনেক আয়োজন, অনেক মজা।  আমরা সবাই যে যার নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী নানাভাবে করতে থাকি নববর্ষ উদযাপন। Social media ভেসে যায় আনন্দ উদযাপনের বিজ্ঞাপনে। এই বিজ্ঞাপনী দুনিয়ায় সকলেই মত্ত থাকে নিজের উৎসব (celebration), সাফল্য (success),  প্রাপ্তি (achievement) ও আনন্দকে অন্য সকলের থেকে ছাপিয়ে জনপ্রিয়তার শিখরে উন্নীত করতে। তা সে নিজের জীবনের চলার পথে কিঞ্চিৎ সাফল্য হোক বা দূরে থেকে প্রিয়জনকে মনে করা হোক – সবই ব্যক্ত করতে চায় এই সোশ্যাল মিডিয়াতেই। আমাদের পোস্ট করা এই ছবিগুলি বা লেখাগুলি নেহাতই মূক, তাই রক্ষা। নাহলে সবার এতো জাহির করার শব্দে আজ পৃথিবীর বুকে মনুষ্য নামক প্রজাতি চলে যেত বিলুপ্তির পথে।

                          আসলে জন্মের পরমুহূর্ত থেকেই এই সমাজই আমাদের প্রতিযোগিতা করতে শেখায়। আর প্রতিযোগিতা মানেই অন্যের থেকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। যার একমাত্র পথই হয়ে দাঁড়ায় নিজের কে জাহির করা – নিজের বিজ্ঞাপন দেওয়া। আর এই পথে চলে মানুষ স্বীকৃতিও পায় বৈকি! আসলে সমাজে আমাদের সামনের মানুষটা আমাদের সম্পর্কে ততটাই জানে যতটা আমরা  নিজেদের দেখাতে চাই ওরফে বিজ্ঞাপন দিই। এ প্রসঙ্গে T. S. Eliot এর একটা উদ্ধৃতি মনে পরে গেলো-

“The worst kind of failure, in my opinion,
Is the man who has to keep on pretending to himself
That he is a success- the man who is the morning
Has to make up his face before he looks in the mirror.”

                        আজ, এই নববর্ষের দিনে যখন সমস্ত পৃথিবী এক গভীর ব্যাধিতে ব্যথিত, যখন আমরা নিজেরা নববর্ষ উদযাপনে জন্য দামী রেস্তোরাঁ তে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছি না, যেখানে খেতে বসে এতদিন আমরা ভুলেই যেতাম রেস্তোরাঁর ওয়েটার বা রাস্তায় থাকা বাচ্চাটার সকাল থেকে কিছু খাবার জুটেছে কিনা। কিন্তু আজ এই বিশেষ রোগটির সংক্রমণের ভয় আমাদের বাধ্য করায় রাস্তার ধারের ওই বাচ্ছা বা রেস্তোরাঁর ওই ওয়েটার টিকেও নিয়ে  ভাবতে – ‘তারাও কি হতে পারে সংক্রমণ এর বাহক!’। যদিও ভাবনাটা প্রাথমিক ভাবে শুরু হয় স্বার্থপর ভাবেই – শুধুই নিজেকে সংক্রমণ থেকে মুক্ত রাখার তাগিদেই।  

                         কিন্তু, তবুও দিনের শেষে আজকের এই নববর্ষে যখন উদযাপন-প্রিয় বাঙালি তথা মনুষ্যজাতি উদযাপন থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হয়ে নিজেকে খুবই অসহায় মনে করে, তখন , কখন যেন মনের অজান্তেই সে রাস্তার ধারের ওই বাচ্চাটির দিকে তার মানবিক দৃষ্টি দিয়ে দেখার সময় পায় – আর একাত্ম বোধ করে। বোঝে তাদের উভয়ের পরিচয়ই এক – মানুষ, যে পরিচয়েতে নেই কোনো উঁচুনিচু ভেদ। তখনই জাগরণ ঘটে তার অন্তরাত্মার, আর সে বোঝে তার career-success-achievement সোশ্যাল মিডিয়ার ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ডের মাধ্যমে সবাই কে জানানোর মধ্যে যে সুখ ছিল তার চেয়ে ঢের বেশি আনন্দের স্বাদ আছে এই মানবিক জগতে যেখানে সকলের সাথে  হাতে-হাত মিলিয়ে থাকা যায়।

                      তাই আজকের এই ঘর বন্দি দশা যেন আমাদের সকলের কাছেই হয় গুটিপোকার নিজেকে গুটির মধ্যে লুকিয়ে নেবার মতোই, আমরা সবাই যেন এই গুটি থেকে প্রজাপতি হয়েই বেরোতে পারি। 

                      মঙ্গলময়ের কাছে এই প্রার্থনাই করি আগামী বছরের নববর্ষে যেন নিজের আনন্দ – সাফল্য – প্রাপ্তি কে জাহির করার প্রয়োজন না পরে, তখন আমাদের সাফল্যের গান যেন ধ্বনিত হয় সমস্ত বিশ্ব চরাচরে।

প্রিয়াঙ্গনা দেব , রসায়ন এ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর (প্রেসিডেন্সি কলেজ , কলিকাতা ) ডিগ্রী অর্জনের পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এ গবেষণারতা। একই সাথে, কলিকাতার একটি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরতা ।

Image courtesy: @reesham.shahab.tirtho (Tirtho on Instagram)

Leave a Reply

Your email address will not be published.