অসাম্যের নতুন হাতিয়ার : লকডাউন

প্রথম প্রকাশিত: শ্রমজীবী ভাষা; ১৬ এপ্রিল, ২০২০ ডিজিটাল সংখ্যায়। অনুমতি নিয়ে প্রকাশিত।

স্থবির দাশগুপ্ত

একদিক থেকে দেখলে, নব সাজে সজ্জিত ‘করোনা’ ভাইরাস বিশ্বমানবের কাছে সাম্যের বার্তা এনে দিয়েছে। প্রকৃতির এক অনিবার্য, অমোঘ সৃষ্টি হিসেবে সে দেখিয়ে দিয়েছে, তার সামনে ধনী-দরিদ্র, ধার্মিক-অধার্মিকের কোনও ভেদাভেদ নেই। মানচিত্রের দিকে তাকালেও সামান্য কয়েকটি দেশ ছাড়া বাকি কেউই তার রক্তচক্ষু এড়াতে পারেনি। তার মানে, চরিত্রের দিক থেকে তাকে সাম্যবাদীই বলা যায়। কার্ল মার্ক্স বলেছিলেন, অস্ত্রের জোরে দেশটাকে দখল করে, ভারতীয়দের উপর তুমুল দুর্ভোগ চাপিয়ে দিয়ে ইংল্যান্ড যত দোষই করে থাকুক না-কেন, আসলে সে কিন্তু ইতিহাসের অচেতন যন্ত্র (‘আনকনশাস টুল অফ হিস্ট্রি’) হিসেবেই কাজ করে গেল। তেমনি অনেকে ভাবছেন, ‘করোনা’ ভাইরাস রচিত ‘কোভিড’ রোগটাও যেন আপামর ভারতবাসীকে এককাট্টা করে দিল। 

কিন্তু তা বোধহয় না। কারণ অন্যদিক থেকে দেখলে, রোগটা আসলে কোনও সাম্যের বার্তা দিচ্ছে না; বরং যে-অসাম্য আমাদের মানবসমাজে টিকে আছে, ক্রমশ বাড়ছেও, তাকেই আরও একটু উসকে দিল। যারা সচরাচর তেমন করে দেখতে চান না তাদেরকেও সে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, অসাম্য কাকে বলে, তা কতটা নিদারুণ হতে পারে। অসাম্য মানে শুধু আর্থিক না, ন্যায় আর নিরাপত্তার অসাম্যও যে কী বীভৎস হতে পারে, মাত্র ক’দিনের মধ্যে তা স্পষ্ট হয়ে গেল। যারা আত্মরতিতেই তুষ্ট থাকেন তাদের কাছে ‘মন্বন্তরে মরিনি আমরা’, কথাটা বড় আহ্লাদের, কেননা মন্বন্তরে মরে হতদরিদ্ররাই। এবার কিন্তু মনে হয়, আহ্লাদ করবার মতো তেমন কিছু আর বাকি থাকবে না।

কারণ, মন্বন্তর এখন ঘরে-ঘরে পৌঁছে যাবে, সামাজিক ন্যায় আর নিরাপত্তার অভাবও। হতদরিদ্র, দরিদ্র, নিম্ন মধ্যবিত্ত আর মধ্যবিত্তের সংজ্ঞাগুলো ক্রমশ পালটে যাবে। এইভাবে আগামী কিছুকালের মধ্যে সমাজের ভারসাম্যে যে-পরিবর্তন আসতে চলেছে তার সবটা এখনই আন্দাজ করা সম্ভব না; তবে তার পদধ্বনি একটু কান পাতলে শোনা খুব কঠিন না। রাতারাতি ব্যাঙ্কে গচ্ছিত টাকায় সুদ কমে যাওয়া, চাকরির স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয়, খাদ্যের যোগান আর চাহিদার মধ্যে বিসদৃশ সম্পর্ক, কাজের অনিশ্চয়তা ইত্যাদি অসংখ্য প্রশ্ন জালিকার মতো একটার সঙ্গে আরেকটাঅটুট বন্ধনে জড়িয়ে আছে। সেই জালিকা নীরব থাকে না; তবে তার প্রতিধ্বনি যে কোথায়, কতদূর গিয়ে পৌঁছবে তা এখনই হিসেব করে ওঠা মুশকিল। হিসেব চলছে।

খবরে প্রকাশ, টাটাবাবু নাকি আমাদের সাহস জুগিয়ে বলেছেন, ভয় কীসের? আণবিক বোমায় বিধ্বস্ত জাপান যদি জেগে উঠে একটা অন্যতম বিশ্বশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে তাহলে আমরাও পারব বৈকী! আমরা অবশ্য জানি, আণবিক বোমার ধ্বংসকর্ম আর ভাইরাস-ঘটিত দুর্ভোগকে একই সুতোয় গেঁথে ফেলার মতো ধীশক্তি সকলের থাকে না।টাটাবাবুর আছে, তাই নতুন সকালে নতুন বিনিয়োগ, নতুন মুনাফার স্বপ্নে তিনি এখনই বিভোর। তাতে আমাদের বিপদ কমবে এমন ভরসা নেই, কেননা ওদের স্বপ্ন মানে, আমাদের দুঃস্বপ্ন। দুঃস্বপ্নের বাস্তব কারণ এই যে, রাষ্ট্রের হাতে যথেষ্ট খাদ্য মজুত থাকা সত্ত্বেও তা যে যথাসময়ে, যথাস্থানে পৌঁছয় না, সে তো দেখাই যাচ্ছে।তার বদলে আমরা দেখছি, রাজনৈতিক চাতুরি।

রাজনীতিকরা চাতুরি করবে তাতে নতুন কিছু নেই। তবে চাতুরি যে কত নৃশংস, কত ভয়ঙ্কর হতে পারে তা বোধহয় আমাদের তেমন জানা ছিল না। এইবার তা হাড়ে হাড়ে জানলাম। আপাতত তার তিনটে দৃষ্টান্ত যথেষ্ট। এক, আমরা নতুন করে শিখলাম, বিচিত্র পারদর্শী-খচিত মিডিয়া যখন যেভাবে আমাদের ভয় দেখাবে তখন, ঠিক সেভাবেই আমাদের ভয় পেতে হবে, ভয়ের রচনাই গিলতে হবে, আগা-পাশ-তলা ভাবলে চলবে না। দুই, ‘সামাজিক দূরত্ব’ বলে একটা শব্দবন্ধ চালু হয়ে গেল; এর সুদূরপ্রসারী পরিণতি যে কী মারাত্মক হতে পারে আমরা তা না-বুঝেই মেনে নিলাম। আর তিন, ‘লকডাউন’ ঘোষণা করে বুঝিয়ে দেওয়া হল যে, জনমানুষের প্রতি কোনও দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্র বাধ্য না।

অথচ এর কোনওটার জন্য ‘করোনা’ দায়ী ছিল না, সে ছিল অজুহাত মাত্র। আমরা আরও কিছু দেখলাম যা না-দেখলেই ভাল ছিল। দেখলাম, যাদেরকে আমরা পারদর্শী, শিক্ষাগর্বী বলে জানতাম তারা কতটা অবিবেচক, অসামাজিক হতে পারেন। তারা সকাল-সন্ধে আতঙ্ক তো ছড়ালেনই, তারপর আতঙ্কের ‘নিরসন’ ঘটাতে যেসব দাওয়াই বাজারে ছাড়লেন সেগুলো জনমানুষের মাত্র দশ শতাংশের উপরই খাটে। বাড়িতে অঢেল পরিমাণে ‘স্যানিটাইজার’ মজুত রাখা, অসংখ্যবার কনুই অবধি সাবান মেখে হাত ধোয়া, সুভদ্র স্টাইলে হাঁচি, কাশি আর মুখোশ… স্বাস্থ্যরক্ষার এই দুর্মূল্য বিধিনিষেধগুলো নিশ্চয়ই সমাজের নব্বুই শতাংশের উপর ঠিকঠাক খাটবে না। তার উপর তারা অনবরত সরল অঙ্কের হিসেব দেখাচ্ছেন, অথচ অমন অঙ্ক জীববিদ্যায় (বায়োলজি) খাটতেচায় না।

ভাইরাসের সমস্যা তো আসলে জীববিদ্যারই সমস্যা। জীব চলনশীল এবং পরিবর্তনশীল; পরিবেশ, পরিস্থিতি আর সময়ের উদবর্তনে জীবের স্বভাব আর গতি-প্রকৃতি পালটাতে থাকে। জীববিদ্যার ভাষায় তাকে বলে, মিউটেশন। তাই একটা ভাইরাস কিস্কিন্ধ্যায় যে-আচরণ করে, মালটাতে তা নাও করতে পারে; শীতকালে তার যা স্বভাব গ্রীস্মকালে তা পালটে যেতে পারে। ভাইরাস তো প্রকৃতির আদিম বাসিন্দা, আমাদের চেয়ে লক্ষ-লক্ষ বছরের পুরনো, তাই অভিজ্ঞতাতেও অতি প্রাচীন। আমরা বুঝতে চাই বা না-চাই, কোভিড ভাইরাস আমাদের যা শেখাতে চাইছে তা হল, জীব বিবর্তনের গল্প। গল্পটা ডারউইন সাহেবও নিজের মতো করে বলেছিলেন; অনেকে তা মানতে চাইনি। আবার অনেকে ভেবেছিলাম, বিবর্তনের চাকা এখন আমাদেরই হাতে, কেননা আমাদের হাতে আছে, প্রযুক্তি।

অমন ছদ্ম গর্বে বুক ফুলিয়ে আমরা ভুলতে বসেছি যে, প্রকৃতির হাতে যে-প্রযুক্তি আছে তা দিয়ে মাত্র এক মুহূর্তে সে আমাদের সমগ্র মানব প্রজাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে। ভুলেছি যে, বিবর্তনের অঙ্ক একরৈখিক হয় না, তাতে অনিশ্চয়তার উপাদান থাকেই, আর থাকে ‘চান্স’ নামে এক মোক্ষম, অপ্রতিরোধ্য, অন্যতম উপচার। ৪৭০ কোটি বছর আগে পৃথিবী নামে আমাদের এই গ্রহের সৃষ্টি; সেখানে ‘হোমো স্যাপিয়েন্স’ নামে ‘বিজ্ঞ’ মানব প্রজাতির বয়স মাত্র দু’লক্ষ বছর। তার মানে, তার আগে এই ধরিত্রী ছিল জীবাণু আর ভাইরাসের শাসনাধীন। আজও তারাই শাসন করে, কেননা আমাদের শরীরেই আছে প্রায় ৩৮০ লক্ষ কোটি ভাইরাস। আর কল্পলোক রচনা করে আমরা ভাবি, শাসক আমরাই।

নতুন কোভিড ভাইরাস তো আর কিছু না, সে কোনও অন্যায়ও করেনি; সে শুধু এসেছে তার আত্মীয়-পরিজনদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করতে। সে কোথায় কতকাল টিকে থাকবে তা হয়তো  নিজেই জানে না। সে শুধু জানে, কীভাবে টিকে থাকতে হয়, কীভাবে ছড়িয়ে পড়তে হয়, আর কীভাবে গর্বিত মানুষের কল্পলোক ধুলিসাৎ করে দিতে হয়। তার আচরণেও অনিশ্চয়তার উপাদান। সে হাঁচিতে আছে, কাশিতেও; কিন্তু একই সঙ্গে ‘কভু প্রশান্ত কভু অশান্ত, দারুণ স্বেচ্ছাচারী’। সে পরজীবী, তাই বাঁচতে চায়; তার আশ্রয়দাতা মরে গেলে তার নিজেরই সর্বনাশ। তাই কোভিড-সংক্রমণে লোকে দুর্ভোগে পড়ে, কিন্তু মারা যায় না; মৃত্যু একটা ব্যতিক্রম মাত্র। অথচ আমাদের মনের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হল, কৃত্রিম মৃত্যুভয়।

যারা এমন করলেন তারা বিশেষজ্ঞ, স্ব-নির্বাচিত অথবা রাষ্ট্র-নির্বাচিত। তারা একথা বললেন না যে, খোদ চিনের হুবেই প্রদেশে সংক্রমণের আশঙ্কা ছিল ১০০০ মানুষের মধ্যে এক জনের আর মৃত্যুর আশঙ্কা ছিল ২০০০০ জনের মধ্যে এক জনের। তারা ঐকিক নিয়মের অঙ্ক জানেন, ধারাপাতও জানেন; তাই অঙ্ক কষে দেখিয়ে দেন, আজকে এক জন সংক্রামিত হলে ১০০০ জন সংক্রামিত হতে ঠিক কতদিন কত ঘণ্টা লাগবে। তারা দেখিয়ে দেন, ইতালিতে যা ঘটছে তা কিলিমাঞ্জারেও ঘটবে, আমেরিকায় যা করা হয়েছে তা আমাদেরকেও করে ফেলতে হবে। যদি প্রশ্ন ওঠে, কেন, তারা সেই প্রশ্ন অগ্রাহ্য করেন। জনমানুষের কল্যাণে এমন উতসর্গীকৃত প্রাণ যে আমাদের আনাচেকানাচে ছিল আমরা তার টেরও পাইনি।

টের যখন পেলাম তখন বুঝলাম, অন্য কোনও দেশের ধ্বংসকাণ্ড আমাদের দেশেও অবিকল ঘটে যাবে এমন ভাবনার পিছনে সরল বুদ্ধি ছাড়া অন্য কিছু নেই। আমাদের বিশেষজ্ঞরা সরলমনা হতে পারেন, কিন্তু ভাইরাসের তেমন দায় নেই। পরিবেশ বদলায়, পরিস্থিতি পালটে যায়, বাঁচার জন্য ভাইরাসও নিজেকে বারবার নতুন করে সাজিয়ে তোলে। তারা যুদ্ধ করে না, আমাদের শরীরের কোষগুলোর সঙ্গে বোঝাপড়া করে। অথচ আমাদের বলা হল, ভাইরাসের বিরুদ্ধে আমাদের নাকি মরণপণ ‘যুদ্ধ’ করতে হবে। একে তো চৈনিক ভাইরাস, তার উপর জানলাম, আমাদের দেশে নাকি মুসলমানরাই তা ছড়িয়ে দিয়েছে। তার মানে, যুদ্ধের যুক্তিটা পোক্ত হল।কিন্তু ভীত সন্ত্রস্ত নাগরিক কি যুদ্ধের উপযুক্ত? আমাদের দরকার ছিল, সতর্কতা। 

অথচ রাষ্ট্র আমাদের সময়মতো সতর্ক করল না, তার বদলে আমরা দেখতে থাকলাম, একের পর এক কুনাট্য।সতর্ক হলে ভাইরাসের ভারত ভ্রমণ আটকানো যেত, এমন কোনও আহামরি দুরূহ কাজ ছিল না। নাকি, আসলে কাজটা বড্ড দুরূহই ছিল। কারণ, যারা বিদেশ থেকে আসছেন তাদের উপর আবশ্যিক পরীক্ষা চালানো, যারা সন্দেহজনক তাদেরকে সপ্তাহ দুয়েক আলাদা করেরাখা, আর যারা সংক্রামিত তাদেরকে চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসা, এই ছিল কাজের কাজ। চিকিৎসাও তেমন জটিল কিছু না, ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষজনের চিকিৎসার যথেষ্ট অভিজ্ঞতা আমাদের আছে। কিন্তু কাজের কাজ ঠিকমতো করার জন্য দরকার স্বাস্থ্য রক্ষার বুনিয়াদি পরিকাঠামো আর অবকাঠামো। তা নেই। শুরুতেই আমরা গোহারা হেরে বসে আছি।

সেকথা রাষ্ট্রের জানা। তাই সে প্রথমে না-জানার না-বোঝার ভাণ করে, তারপর তাকিয়ে থাকে পশ্চিমা প্রভুর দিকে, আর তারও পরে খোঁজে ফন্দি-ফিকির। পেয়েও যায়। সে বোঝে, তার ব্যর্থতা লুকোনর একমাত্র উপায়, জনমানুষের মনে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেওয়া। বিভ্রান্ত মানুষ ভাবতে ভুলে যায়, যুক্তি তখন পিছে হটে। তখন তাকে অঙুলিহেলনে চালনা করা সহজ। তাই আমরা রাষ্ট্রের এক-একটা নির্দেশ শুনছি আর রোবটের মতো তা পালন করে যাচ্ছি। কোনও সংলাপ নেই, আছে বাণী, আর আমরা শুধু শ্রোতাই না, আমরা আজ্ঞা পালনকারী, নির্বাক কুশীলব। যেন ‘তিনি যেমন বাজান ভেরী, মোদের তেমনি নাচের ভঙ্গী’! কীসের গণতন্ত্র, কীসের সমাজতন্ত্র, অব্যর্থ তর্জনীসংকেতই আমাদের ভাবরাজ্য দখল করে নিল। স্বৈরতন্ত্র জয়ী!

অন্তত, যুদ্ধের আবহ রচনায় সে জয়ী, নিজের সঙ্কট জনমানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে রাষ্ট্র কুনাট্যের প্রথম অঙ্কে জয়ী। কিন্তু এও একরকম ছিল, আমরা ভাবতে পারতাম, দ্বিতীয় অঙ্কে রাষ্ট্রের জয়ের পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখব। তাও কি পারব? কারণ, রাষ্ট্র আরও কিছু কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছে যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সহজ হবে না। যেমন, জনমনে শুধু ভয়ই না, সে ঢুকিয়ে দিয়েছে অবিশ্বাসের বিষ। যেকোনও সুস্থ মানুষের দিকেও আমরা আড়চোখে তাকাতে শিখলাম, অন্য কোনও অসুখে ভুগছেন এমন রোগীকেও আমরা সন্দেহের তালিকায় রেখে দিলাম। আমরা ভুলেই গেলাম যে, যারা অন্যকে সন্দেহ করছি তারা নিজেরাও অন্যদের সন্দেহ থেকে বাদ যাচ্ছেন না। এই সন্দেহ প্রবণতার আয়ুষ্কাল আপাতত অনিশ্চিত।

এইভাবে নাকি একটা সুস্থ, সভ্য সমাজ তৈরি হবে, একথা কেবল উন্মাদই ভাবতে পারে। অনিশ্চয়তার আতঙ্ক এইভাবে আমাদের উন্মাদ করে দেয়। আমরা জমায়েতকে ঘৃণা করতে শিখি, তিন-ফুট-ছয়-ফুট-পনেরো-ফুট দূরত্ব রচনা করে ভাবতে শিখি, ভাইরাসকে আমরা এড়িয়ে যেতে পারব। কেউ ভাববেন, লকডাউন আরও অনেক কাল চললে ভাল। কতকাল? তা জানা নেই। কার পক্ষে ভাল? নিশ্চয়ই তাদেরই পক্ষে যারা নিশ্চিদ্র, নিরুপদ্রব নিদ্রায় কয়েক মাস কাটিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু লকডাউন যখন ‘লক আউট’ রচনা করে, তখন? যারা ক্ষুধার্থ সন্ততি নিয়ে বিনিদ্র রজনী যাপন করছেন তাদের কথা কোন দয়াময় পারদর্শী ভেবেছেন? যারা ভাইরাস চর্চা করতে গিয়ে মানব চর্চা ভুলেছেন, মানব সমাজের চঞ্চল কৌতুক ভুলেছেন, তারা কারা?

তাদেরকে কি আদৌ বিবেচক বলা যায়? যারা কোভিড থেকে এক লক্ষ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা (শুধু আশঙ্কাই) দূর করতে গিয়ে এক কোটি মানুষকে সাক্ষাৎ এবং নিশ্চিত মৃত্যুর পথে ঠেলে দেন তাদেরকে আমরা নির্ভরযোগ্য ভাবি কীকরে? কোভিড যে সংক্রমণের শৃঙ্খল রচনা করে সেকথা আমাদের জানা। এভাবেই ভাইরাস বেঁচে থাকে। কিন্তু সেই শৃঙ্খল আমরা ভাঙব কীকরে? বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, নাগরিকদের অচ্ছুৎ, নজরবন্দি করে রেখেই সংক্রমণের শৃঙ্খল ছিন্ন করে দেওয়া সম্ভব। অথচ যে-সুপণ্ডিত মানুষজন আধুনিক ডাক্তারির পাঠ্য বই লিখেছেন, এখনো লিখে চলেছেন, তারা জানিয়েছেন, এই পদ্ধতি বেমানান, সেকেলে আর তাতে উপকারের চেয়ে ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি। এই পাঠ্য বই যে বিশেষজ্ঞরা পড়েননি তা তো না।

তাহলে? তাই মনে হয়, কোভিডের মোকাবিলায় শাস্ত্রজ্ঞান কাজে লাগে না, লাগে রাজনীতির জ্ঞান। যারা শাস্ত্রজ্ঞান মানেন তারা জানেন, কোনও এক যাদুবলে অথবা জনমানুষের উপর জোর-জবরদস্তি করে আপাতভাবে, সামান্যকালের জন্য যদি সংক্রমণের শৃঙ্খল ছিন্ন করা যায়ও, তাতে ‘যুদ্ধজয়’ হবে না। কারণ, এর পরে দেশের প্রায় ষাট শতাংশ মানুষ থেকে যাবেন যারা সংক্রামিত কিন্তু বিপদগ্রস্ত না। তাদের শরীরে করোনা থেকে যাবে নিশ্চুপ, উৎপাতহীন; তাই তারা থাকবেন, উপসর্গবিহীন। কিন্তু নীরবে অন্যকে সংক্রামিত করার সমস্ত আশঙ্কাই বলবত থাকবে। তখন হয়তো আমরা ভাবতে বসব, এত আড়ম্বর করে কোন শৃঙ্খল ছিন্ন করেছিলাম? হয়তো নিজেদের নির্বুদ্ধিতার কথা ভেবে নিজেদের গালেই চড় কষাব।এই নিষ্ঠুর পরিণতিই কি অপেক্ষমান?

শুধু অপেক্ষমান কি আর বলা যায়? লকডাউন আর আতঙ্ক নির্মাণের নানান নিষ্ঠুর পরিণতি তো চোখের সামনেই ঘটছে। সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে প্রায় যাবতীয় স্বাস্থ্য পরিষেবা স্তব্ধ, স্থবির হয়ে আছে। যারা আসন্নপ্রসবা তারা দিশেহারা, যারা অন্যান্য ব্যাধির প্রকোপে কাহিল তারা অস্থির, বেহাল। হাসপাতাল থেকে গুরুতর অসুস্থ রোগীকে রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কীসের সেবা আর পরিষেবা? কোথায় আইন? কোথায় জনমানুষের কষ্টার্জিত গণতান্ত্রিক অধিকার? সবই তো হেলায় উড়িয়ে দেওয়া যায়। একটা ভাইরাসের মেধার সামনে আমরা সবাই কেমন বিস্রস্ত, বিবশ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। কোথায় রইল আমাদের সভ্যতা, কোথায় রইল আমাদের আত্মম্ভরিতা?আজ এই ভাইরাস, কাল তো আরেক ভাইরাস আসবে, আসবেই। আমরা কিংকর্তব্যবিমূঢ়!

শুধু রাজনৈতিক চাল আর চাতুরি নিয়ে জৈবিক সমস্যারমুখোমুখি হলে এই পরিণতি অবশ্যম্ভাবী। চতুর, ভণ্ড রাজনীতি আমাদের গর্বোদ্ধত হতে শেখায়, প্রকৃতির সঙ্গে, তার অগণন সন্তানের সঙ্গে বোঝাপড়া করে বাঁচতে শেখায় না। তাই আমরা কথায়-কথায় যুদ্ধের ধুয়ো তুলি। আমরা হয় নিজেরা ভ্রষ্ট রাজনীতি করি অথবা তার শিকার হয়ে যাই। আর একথাও ভুলে যাই যে, যুদ্ধ হল রাজনীতিরই সর্বোচ্চ রূপ, সে রাজনীতির স্বার্থই রক্ষা করে। ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধও কোনও ব্যতিক্রম না। যুদ্ধে নামলে তার হাতে আমাদের তুর্কি নাচন নাচতেই হবে। আমরা যুদ্ধের বিচিত্র পদ্ধতি আবিষ্কার করব, পরিসংখ্যানের পাহাড় নির্মাণ করব; কিন্তু ভাইরাস আমাদের সঙ্গে থাকতেই চাইবে, আমাদের পছন্দ-অপছন্দে তার কোনও উৎসাহ নেই।

তাই মনে হয়, ভাইরাস নিয়ে থাকতে গেলে উপায় মাত্র দুটো, – এক, যূথবদ্ধ অনাক্রম্যতা (‘হার্ড ইমিউনিটি’) আর দুই, টিকা। প্রথমটা ঘটে স্বাভাবিকভাবে, আর দ্বিতীয়টা আসে গবেষণাগার থেকে। কোনওটাই আমাদের নিশ্চিন্ত করতে পারে না, তবু তারা অগতির গতি। তার মানে, জীবনের একমাত্র, নিগূঢ় সত্য হল, অনিশ্চয়তা। সেই সত্য মেনে নিয়ে কীভাবে, কতটা শান্তিতে আর স্বস্তিতে থাকা যায় তার উপায় উদ্ভাবনের দায় বিজ্ঞানের।

এইবিজ্ঞান চেতনা অস্বীকার করে আধুনিক, উদ্ধত মানুষ হিসেবে আমরা যেপথে এগোচ্ছি তাতে মনে হয়, এইভাবে, ক্রমশ, দর্শনমুগ্ধ, মিলনপিয়াসী মানুষ হয়তো অন্য কোনও হিংস্র কিন্তু সদা-সন্ত্রস্ত জন্তুতে পরিণত হবে। আকাশচুম্বী অসাম্যই হবে সেই আত্মঘাতি জগতের মূল মন্ত্র।

স্থবির দাশগুপ্ত পেশায় ক্যান্সারের চিকিৎসক। তার স্কুলজীবন কেটেছে চিত্তরঞ্জনে। কলেজ জীবন কলকাতায় ( আর . জি.  কর মেডিক্যাল কলেজ ) । জনস্বাস্থ্য, ব্যাধি — বিশেষ করে ক্যান্সার — নিয়ে তার নানা লেখা পাঠকমহলে সমাদৃত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *