সীমান্তে

কবিঃ য়োর্গে লুই বোরহেস

তরজমাঃ শাওন বসু

সূর্য যখন ডোবে, শহরের কিছু রাস্তা তার সাথে সাথেই মিলিয়ে যায়।
এই রাস্তাগুলোর মধ্যেই একটা রাস্তা এমন আছে – কোনটে, সঠিক করে
বলতে পারব না – যা হয়তো অজান্তেই শেষবারের মত হেঁটে চলে এলাম,
এইমাত্র, কোন গূঢ় গভীর পাশা খেলায় সৃয়মাণ গুটি যেন।

এই সবকিছুরই পিছনে এক সর্বশক্তিমান বিধাতা বসে আছেন
আগে থেকেই যিনি একটি জাল ফেঁদে রেখেছেন।
সে জালে ধরা পড়ে যাচ্ছে সমস্ত গোপনের, সমস্ত স্বপনের
আলো-ছায়া-কায়া যা দিয়ে বোনা জীবনের এই নকশিকাঁথা।

সবেরই যদি সীমা থাকে, থাকে একটা যুতসই মাপ-বাঁধা গত,
থাকে শেষবার, থাকে আর-কিছু-নয়, থাকে বিস্মরণ;
তবে কে বলে দেবে আমাদের, অজান্তেই এই ঘরের কোনো মানুষকে
শেষ বিদায় জানিয়ে এলাম কিনা?

ভোরের জানালা দিয়ে রাতের পর্দা উঠে গেল।
মলিন টেবিলে পড়ে থাকা বইগুলো আঁকাবাঁকা ছায়া ফেলেছে।
এই বইগুলোর মধ্যেই একটা বই আছে এমন
যে বইটা পড়ব না কোনদিন।

দক্ষিণদিকে জীর্ণপ্রায় গেট আছে একটা।
পাশে একটা সিমেন্টের টব, তাতে একটা ক্যাকটাস।
ওই গেটে প্রবেশাধিকার নেই আমার —
বইয়ের পাতায় লিথোগ্রাফ প্রিন্ট যেন।

একটি দরজা, যা তুমি চিরতরে বন্ধ করেছো।
আর একটি আয়না, যা বৃথাই অপেক্ষা করে তোমার।
তোমার সামনেই চৌরাস্তা, অবাধ,
তবে মাথার কাছে চার-মাথা-ধারী জানুস, নজরবন্দি করেছে তোমায়।

স্মৃতির ভিড়ে একটি স্মৃতি এমন আছে যা হারিয়ে গেছে চিরতরে।
ওই স্মৃতিখানি আর কখনই তোমার ডাকে সাড়া দেবেনা।
ওই ঝরনাটির তলায় নাইতে যেতে দেখা যাবেনা তোমাকে,
শ্বেত সূর্য কিংবা পীত চন্দ্রালোকে।

পারস্যের কবি তাঁর পাখি আর গোলাপে বোনা ভাষায়
কি বললেন, তা আর জানা হবেনা তোমার।
অস্তরাগের শেষ আলোয় তোমার সাধ হয়
জীবনের যা কিছু অবিস্মরণীয়, তাকে শব্দের বেড়ি পরাও।

স্রোতস্বিনী গঙ্গা — সেতু থেকে ঝুঁকে দেখি আমি —
বয়ে চলে যায় — বিশাল বিগত অতীত।
এই সমস্তটাই হারিয়ে যাবে,
রোমের আগুনে যেমন গেছিল কার্থেজ।

ভোর হয়ে এলো।
জনতার কলরোল কানে আসে, মিলায় আবার।
তারা সকলেই আমাকে ভালবেসেছে, ভুলে গেছে।
স্থান-কাল-পাত্র-শাওন,
এ সমস্তই এখন ছেড়ে যাচ্ছে আমাকে।

ছবিঃ কাজিমির মালেভিচ, “রেড ক্যাভেলরী”, ১৯৩২ (উৎস: Wikiart)

শাওন বসু একজন চিত্রশিল্পী এবং লেখক। শাওন শিল্প এবং সংস্কৃতি বিষয়ক লেখা লেখেন। শাওন শিল্পের ইতিহাস এবং নন্দনতত্ত্ব নিয়ে স্নাতকোত্তর স্তরে পড়াশুনো করছেন।

আপনার প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা, ইত্যাদি আমাদেরকে পাঠাতে ইমেইল করুন এই ঠিকানায়: timesofcorona@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *