আর্ট এডিশন ২, চতুর্থ দিন: ক্ষৌণীশ কয়াল

ক্ষৌণীশ কয়াল

আমাদের আজকের শিল্পী ক্ষৌণীশ কয়াল। ক্ষৌণীশের বাড়ি পশ্চিমবঙ্গে, তবে কর্মসূত্রে এখন তিনি মুম্বই নিবাসী। তিনি পেশাগতভাবে একজন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ।  প্রফেশন না হলেও আঁকা বরাবরই তার প্রিয় একটা বিষয়। সেভাবে প্রথাগত ভাবে শেখেননি কখনো। ভালো লাগা থেকেই আঁকেন। 

রঙ তুলির সাথে যোগাযোগ যখন প্রায় উঠে গেছে সময়ের চাপে , তখন ডিজিটাল পেইন্টিং এর সাথে ক্ষৌণীশের পরিচয় হয়। তার কথায় — “ধীরে আবার ফিরে পেলাম আঁকাকে। প্রতিদিনের শেষে যে সব মুহূর্তের কাছে আমরা বারেবারে ফিরে যেতে চাই, আমি চেষ্টা করি তাদের ফুটিয়ে তুলতে। এই প্রকৃতিতে শান্ত যা কিছু , তাদের নিয়েই ছবি আঁকতে আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে। “

ক্ষৌণীশের আঁকা কিছু ছবি এবং ছবিগুলি সংক্রান্ত তাঁর অনুভূতি নিচে দেওয়া হল:

অনেক রাতে মন খারাপ হলে আমার মাঝে মাঝে এই জায়গাটার কথা মনে পড়ে। আমাদের বাড়ির জানলা দিয়ে দেখা যায় পুব দিকের এই কালচে হলুদ বাড়িটা। পুরনো জমিদার আমলের একটা বাড়ি। লোকজন তেমন থাকে না। তার ঠিক সামনে একটা ছোট্ট পুকুর। বুড়ো তেঁতুল গাছের ক’টা ডাল ছুঁয়ে রয়েছে পুকুরটাকে। সবুজে সাদা মেশানো ছোট ছোট কচুরিপানার দল ভেসে আছে এদিক ওদিক। পুকুরের ঠিক সামনেই একটা ফাঁকা জায়গা পেরোলেই আমাদের বাড়ি।”

স্কুল ছুটি হলে বাড়ি ফিরে এসে বসতাম জানলায়। পিছনের মাঠে ছায়া পড়ে আসতো উঁচু বাড়িগুলো ফাঁকে ফাঁকে। শেষ বিকেলের যেটুকু রোদ্দুর তাদের পেরিয়ে আসতে পারতো , ডুব দিত সেই পুকুরের জলে। চিক চিক করে উঠতো সোনার মতো। সেই আলোয় তেঁতুল গাছের পাতাগুলো হলুদ হয়ে সন্ধ্যে প্রদীপ জ্বালিয়ে দিত কালচে হলুদ বাড়িটায়। ধীরে ধীরে গাঢ় হতো অন্ধকার। তেঁতুল গাছের ছায়ায় মায়াবী কথারা মিলিয়ে আসতো । আমি সবটা দেখতাম একমনে । শুনতাম তাদের কথা।

ঠিক এমন সময় কেউ এসে জ্বালিয়ে দিত পোস্টের আলোটা ।
একরাশ নিস্তব্ধতা ভেসে উঠতো তেঁতুল গাছের নুইয়ে পড়া ডালে, পানাগুলোর কালো ছায়ার আনাচে কানাচে। আর হলদে আলোগুলো, কিছু শুয়ে পড়তো পোস্টের তলায় রাখা গাছটার ঠিক মাথায়, আর তাদের মতোই দেখতে কয়েকজন মিশে যেত জলে …


সন্ধেবেলা, অনেকদিন পর ..আমি, ভুট্টুম আর তিতুই একটু হাঁটতে বেড়িয়েছিলাম। ঝুপসাগরের জল দেখি অনেক পরিষ্কার হয়ে গেছে । কাচের গুলির মতো বুদবুদ গুলো হাসতে হাসতে বেলুনের মতো ভেসে উঠছে আকাশে। তাই দেখে তিতুই এর সে কী হাসি! ভুট্টুমও লেজ নাড়িয়ে সায় দেয় তাতে।

ওই যে বুড়ো শ্যাওলার জঙ্গল ওর তলায় কচি কচি ঘাসগুলো দুলে দুলে ওঠে হাওয়া দিলেই।

আমরা যাবো ওই যে দূরের বৃষ্টি নামা নীল পাহাড়, ওইখানে।

নীল পাহাড়ের লাল ফুল খুব পছন্দ। গত হপ্তায় তার চিঠি পেয়েছি মেঘের ডাকে। ওর জন্য একটা মুকুট বানিয়ে দেব। বেশ লাগবে।


পাথুরে শহরে বহুদিন একা। কিছু ভালো লাগেনা আজকাল। এমনই কোনো রুক্ষ দুপুরে জানলার ধারে বসে আকাশ দেখি। শূন্যের মধ্যে যে অনন্ত অসীমতা থাকে তাকে খুঁজে যাই। একটা পাখি এসে বসে শ্যাওলা জমা পাঁচিলটায়। একলা বেড়ে ওঠা গাছটা আনমনে ফেরে একরাশ অপেক্ষা নিয়ে। আমাদের মধ্যে এই “একলা” টার বড্ড মিল।
খানিক পরেই আকাশ জুড়ে ভেসে যায় আষাঢ়ে মেঘ। অপেক্ষার গাছটায় একলা পাখিটা হেসে উঠে দোল খায়। আর আমার, অনেক দিনের বৃষ্টিতে ধুয়ে যায় মন কেমনের শহর।


পৃথিবীর অসুখ। বহু বহু মাইল পার হলে যাদের বাড়ি ফেরা যায়, তেমন ক’জন মানুষ হেঁটে চলেছে ..হেঁটেই চলেছে। তাদের কাছে দেশের খবর পৌঁছোয়না। পৌঁছয়না কত লোক ফেরে বিদেশ থেকে। ওরা মাঠ পেরোয়, গ্রাম পেরোয়, পাহাড় পেরোয়। নদী পেরোয়। রাস্তা জানা নেই। তাই যে পথ দিয়ে রেল গাড়ি দূরে চলে যায়, তাদের বাড়ির দিক যে প্রান্তে, সেই লাইন ধরে হাঁটতে থাকে তারা..। আমাদের খবর ওরা পায়না। শুধু আমরা পাই ওদের । এক জোড়া চোখ ওদের দেখে যায় কেবল। সে চোখ তোমার ..আমার… দল..রাজ্য…রাষ্ট্র এমনকি সব কিছু দেখা বিধাতারও। আমরা শুধু দেখেই চলেছি..আর ওরা হাঁটতে হাঁটতে মিলিয়ে যায় দূরের রেল লাইনের বাঁকে।


অজানা গ্রামের পথে ঘুরতে আমার বেশ লাগে। যতদূর চলে গেলে শহর সাদাটে হয়ে যায়, ততদূর গিয়ে গন্ধ কুড়োই আমি। একটা মুখ আঁকা খালি কাঁচের বয়ামে তাদের ভরে রাখি। প্রতিটা মাঠের একটা নিজস্ব গন্ধ থাকে। মাটির গন্ধ, কচিবুড়ো গাছের গন্ধ, পাখিদের ডানায় বয়ে আনা গন্ধ.. আরো কত কী! আমার ভারী ভালো লাগে। যাওয়ার পথের ধারে ধারে ভুট্টা গাছগুলো ফোয়ারার মতো দেখতে লাগে এই মালভূমি অঞ্চলে। বিকেলের পড়া শেষে সুয্যি মামা তারে বসে থাকা লক্ষ্মীবাহনটিকে বলেন,” যাহ! আজ তোর ছুটি।” সেই শুনে আমি ফিক করে হেসে ফেলি। আর অমনি লাট্টুর মতো মুখ ঘুরিয়ে কড়া চোখে চায় সে । ক’টা বুলবুলি গিয়ে বসে ভুট্টা গাছগুলোর মাথায়। এদিক ওদিক লাফায় ওরা। আলতা পরা রঙ মাখে পশ্চিম আকাশ। মেঘ জমে জমে পাহাড় জমায় তার ঠিক সামনে। ঠিকরে পড়ে সোনা রঙ। আমি ছোটবেলায় ফিরে যাই। আমাদের বাড়ির সামনের বড়ো গাছ গুলো মধ্যে দিয়ে সেই রঙ ছড়িয়ে পড়ে অযত্নে বেড়ে ওঠা ঘাসফুলের মাথায়। কালো ছায়ায় দাঁড়িয়ে ওদের দেখি আমি। রাখির মতো লাগে তাদের। এক অদ্ভুত গন্ধ আসে। বয়ামের ঢাকনাটা খুলে দিয়ে তাদের মুঠো করে ভরতে থাকি , যতটা ভরলে উপচে পড়ার ভয় থাকেনা।
ফেরার পথ ধরি। জ্বলতে থাকা গাছের মাথায় নেমে আসে অন্ধকার। দূরের শহরে ফুটে ওঠে হলুদ রঙের আলো..


সন্ধে আকাশে একরাশ বিষণ্ণতা ছড়িয়ে কালো পাহাড়ি মেঘের দল পাড়ি দিল অস্তাচলে। ছেলেবেলা ভোলা দুই বন্ধু এসে দাঁড়ায় বঁড়শি গাঁথা নদীটার পাড়ে। অন্ধকারে তাদের দেখা যায়না তেমন। শুধু হাওয়া বয়। একটা ভাঙ্গা সাঁকোর ছায়া এঁকে বেঁকে মিশে যায় জলে। গেলো বছরেও রথের মেলায় কেউ তার গলায় সুন্দর করে সোনা রঙের আলোর হার গড়িয়ে দিয়েছিল। আজ এতদিন পর, মনে পড়ে না তার… কে কবে শেষ পার হয়েছিল। দু’হাত জুড়ে শুধুই চেরা চেরা ক্ষত। হাওয়া ভাসলে ওরা কেঁপে ওঠে। নদীটা মাঝে মাঝেই সাদা আঁক কেটে ভোলায় তাকে, আবার মিলিয়ে যায় কালোয়। ফিকে হয়ে আসে সব।
দুই বন্ধু দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ, দেখা যায়না তাদের। শুধু হাওয়া বয়ে যায় আলতো ভাবে…


পাহাড়ের বুকে যে কাটা জয়াগাটা নীচ থেকে দেখা যায় , আমি আর বাবা মাঝেমাঝেই বিকেল হলে সাইকেলে চেপে পৌঁছে যেতাম সেখানে। পাহাড়ে ঘেরা পুরো গ্রামটাকে দেখা যেত সেখান থেকে। সাইকেলটা রেখে একটা জায়গা খুঁজে বসতাম আমরা।কমলা হলুদ মেশানো আলো ভেসে বেড়ায় গ্রামের উপর দিয়ে। ছোটো ছোটো কালো ছায়া, বাড়িগুলো দখল করতো একে একে। বামদিকের সাদা মন্দিরটা একাই সবুজের মধ্যে লালরঙা পতাকা মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। শিবরাত্রির মেলায় তাকে গ্রামের লোক সাজিয়ে দিয়ে যায়। ভারী ভালো লাগে তার ওই কটা দিন।
বাবা আমি পাশাপাশি বসে সব দেখতাম। শুনতে পেতাম তাদের কথা.. তার পর আবার হঠাৎ করেই সব চুপ হয়ে যেত। এমনি সময় বাবা গল্প বলতেন। তাঁর ছোটোবেলার গল্প, ফেলে আসা গ্রামের গল্প, লালরঙা বিকেলের গল্প। সেই ছবি স্পষ্ট হলে, আমার গ্রামে সন্ধে নামত। দু’ তিনটে তারা দেখা যায় আকাশের শেষ নীলচে অংশটায়।
সাইকেল নামতে থাকে পাহাড়ি ঢাল বেয়ে, রাস্তার ধারে ধারে কিছু দূরে আলো জ্বালিয়ে ফেরে কারা।
বাবার ছোটবেলা, সময় পেরিয়ে যেতে থাকে সাইকেলের চাকায়। আর আমি পিছনে ফিরে দেখি, কালো বাড়ির ফাঁকে ফাঁকে আলো জ্বলে উঠছে একে একে।


আমরা যারা বোতলবন্দী, স্বপ্ন দেখি অনেক রাতে।
সমস্ত দিন লিখে রাখি, একলা আকাশ এক তারাতে।


আপনার লেখা, আঁকা, অথবা আপনার কোভিড-১৯ এর অভিজ্ঞতা, গল্প, কবিতা আমাদের সাথে ভাগ করে নিতে/ আমাদের সাথে পাবলিশ করতে আমাদের মেইল করুন timesofcorona@gmail.com এ। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *